রাশিয়ার বিরুদ্ধে গত শুক্রবার নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ভারতের গুজরাটে রুশ জ্বালানি কোম্পানি রোজনেফটের আংশিক মালিকানাধীন জ্বালানি তেল পরিশোধন কোম্পানি নায়ারা এনার্জি পরিচালিত একটি পরিশোধনাগারও এ বিধিনিষেধের আওতায় পড়েছে। এ বিধিনিষেধ কার্যকর হলে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ভাদিনার রিফাইনারি থেকে ইইউতে জ্বালানি পণ্য রফতানি বন্ধ হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ব্যাংক ও বীমা-সেবা গ্রহণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে কোম্পানিটির জন্য। এছাড়া রুশ জ্বালানি তেল আমদানি, পরিবহন ও পরিশোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক সেবা গ্রহণ সীমিত করে দেয়ার মতো পদক্ষেপও নেয়া হতে পারে বলে ইইউর নতুন ঘোষিত বিধিনিষেধে বলা হয়েছে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও খালিজ টাইমস।
শুধু নায়ারা এনার্জি নয়, নতুন বিধিনিষেধে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হতে পারে মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডও (আরআইএল)। আরআইএলের রোজনেফটের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি রয়েছে, যার অধীনে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিসকাউন্টে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক ধরনের উভয় সংকটে পড়েছে আরআইএল। রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করলে ইউরোপের ডিজেল সরবরাহের লাভজনক ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়তে পারে কোম্পানিটির। আবার বিধিনিষেধ অনুসরণ করে রোজনেফট থেকে জ্বালানি তেল কেনা বন্ধ করে দিলে সাশ্রয়ী দামে পণ্যটির জোগান নিশ্চিত করা নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়বে আরআইএল। উভয় পরিস্থিতিতেই রিলায়েন্সের রিফাইনিং মার্জিন চাপের মুখে পড়ে যাওয়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইইউর এ নিষেধাজ্ঞাকে এরই মধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। নয়াদিল্লি বলেছে, একতরফাভাবে গৃহীত এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধকে সমর্থন করে না দেশটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করি।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, দায়িত্বশীল একটি পক্ষ হিসেবে ভারত আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘দ্বিমুখী নীতি’ অনুসরণ করা উচিত নয় বলেও বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেন রণধীর জয়সওয়াল। পরে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটেও তার এ বক্তব্য প্রকাশ করা হয়।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে গত শুক্রবার ঘোষিত ইইউর ১৮তম বিধিনিষেধ প্যাকেজে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত রুশ জ্বালানি তেলের মূল্যসীমা বর্তমান ৬০ ডলার থেকে কমিয়ে ৪৭ ডলার ৬০ সেন্ট নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া এ জ্বালানি তেল পরিবহনে জড়িত জাহাজগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
এছাড়া ইইউ এখন থেকে অন্য কোনো দেশ থেকেও রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল থেকে তৈরি পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি না করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে নরওয়ে, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সুইজারল্যান্ড থেকে আমদানির ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না বলে ইইউ কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে খালিজ টাইমস জানিয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রুশ জ্বালানি খাতকে চাপে ফেলতে ইইউ এ ধরনের বিধিনিষেধ জারি করেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে রুশ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না করেই দেশটির জ্বালানি খাত থেকে আয়কে আরো চাপে ফেলতে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে ইইউ।
নায়ারা এনার্জি পরিচালিত ভাদিনার রিফাইনারির দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতা চার লাখ ব্যারেল। এছাড়া ভারতে সাত হাজারের বেশি জ্বালানি আউটলেট রয়েছে কোম্পানিটির। পরিশোধনাগারের পাশেই নায়ারার একটি পেট্রোকেমিক্যাল প্লান্ট উন্নয়নের কাজ চলছে।
কোম্পানিটিতে রোজনেফটের মালিকানার পরিমাণ ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। সমপরিমাণ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে বিনিয়োগ কনসোর্টিয়াম এসপিভি কেসানি এন্টারপ্রাইজেস কোম্পানি লিমিটেডের হাতে। বাকি শেয়ার মালিকানা রয়েছে পুঁজিবাজারের খুচরা বিনিয়োগকারীদের হাতে।
বর্তমানে কোম্পানিটি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে চাইছে রোসনেফট। মার্কিন ও ইউরোপীয় বিধিনিষেধের কারণে নায়ারায় বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফা তুলে নিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যেই ইইউর নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ রুশ জ্বালানি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটির এ বিনিয়োগ প্রত্যাহার পরিকল্পনাকে আরো কঠিন করে তুলেছে।